Monthly Archives: August 2015

স্বপ্নের মায়া অঞ্জন

প্রথম আলাপ ফেসবুকে। সখ্য গড়ে ওঠে ধিরে। মিশুকে বলা চলে না মোটেও। খানিক অন্তর্মুখী, খানিক নিঃস্পৃহ। নাকি উদাসীন? খুব নরম মনের মানুষ। আমার ভালোবাসার মানুষ। তবু সাক্ষাৎকার নেব শুনে গুটিয়ে গেলেন আরও। আর মনঃস্থির করেছি যখন আমাকে ঠেকায় কে? ফোনে রীতিমত থ্রেট। অঞ্জন-দা, অনেক গবেষণা হয়েছে আপনার, করাচ্ছেন, করাবেন, কিন্তু আজ যেন বিকেল বিকেল মোচ্ছবতলা ঘাটে চলে আসেন। যেমন আন্দাজ করেছিলাম, উত্তর তেমনই এল। কিরীটী, আজ ভাই বিকেলে মিটিং। আমি তৈরি ছিলাম। মিটিং? ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি আপনার মিটিং রুমে, বিকেল পাঁচটায়। বুঝে গেলেন এ তো ছাড়বার পাত্র নয়।

সময়ের আগেই চলে এলেন অঞ্জন বর্মণ। কবি অঞ্জন বর্মণ। মেধাবী অঞ্জন — কবি, কবিতা প্রেমী অঞ্জন। প্রশ্ন আমার আর উত্তর দেওয়ার কথা ওঁর। এ দেখি উলটো পুরাণ। প্রথম প্রশ্ন ওঁর ঠোঁটে যেন এঁটে ছিল। বিরক্তির সুরেই বললেন, এতো জায়গা থাকতে তুমি আমায় এই মোচ্ছবতলায় ডাকলে কেন কিরীটী?

পানিহাটি ফেরিঘাট মোচ্ছবতলা ঘাট নামে সমধিক পরিচিত। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছি এমন ভাব করলাম। উত্তর মন মতো না হলে যেন ক্ষেপে না যায় মানুষটা। বললাম, কবিদের মোচ্ছব শুনেছেন অঞ্জন-দা? বাঙালি কবিদলে নাম তুললেন, আর মোচ্ছবে আপত্তি করলে চলে বলুন? আহা! শ্রীচৈতন্যের স্মৃতিবিজড়িত এই ঘাট। কৃষ্ণ-নামের ঘাট। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজী, রামকৃষ্ণ পরমহংস এসেছেন এখানে। ভালোবাসা আর অধুনা প্রেমের ঘাট।

ঘাট হয়েছে, ভাই। নাও শুরু কর।

১। প্রথম কবিতার বই। নামটি চমৎকার। স্বপ্নসায়রে একা। উত্তেজনার পারদ নিশ্চয়ই তুঙ্গে?

প্রথম কবিতার বই, বস্তুত প্রথম সাহিত্যের বই তাই আশঙ্কামিশ্রিত উত্তেজনা তো ছিলই। বিভিন্ন পেশাগত ও পারিবারিক ব্যস্ততার মাঝে বইএর কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা নজর রাখাটা বেশ কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু বইটি প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পরে উত্তেজনা ও আশঙ্কার জায়গা নিয়েছে কৌতূহল। পাঠকেরা কেমনভাবে নেবেন আমার এই প্রচেষ্টা সেটা জানার কৌতূহল রইল।

২। কবিতা কেন? নিজের কথা, মনের কথা, আবেগের বিষয় বস্তু তো গল্পেও লিখে ফেলা যায়। সাহিত্যের যে শাখাটিকে বেছে নিয়েছেন, এই নির্বাচন কি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল?

কবিতা আমার কাছে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এসেছে। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ সমানভাবে পড়েছি কিন্তু নিজের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে প্রথম থেকে কবিতাকেই বেছে নিয়েছিলাম। ছেলেবেলায় ছন্দের প্রতি আকর্ষণ ছিল পরে সেই জায়গা নিয়েছে চিন্তার গভীরতা ও প্রকাশের ব্যুৎপত্তি। কবিতার মধ্যে শব্দের ব্যঞ্জনা, ভাবনার বিমূর্ততা, চিত্রকল্পের অনুচ্চকিত সৌন্দর্য মনে গভীরভাবে নাড়া দিত। তাই কবিতা।

৩। কবিতার পাঠক সীমিত। চিন্তা হয় না আপনার? বই বিক্রি কম না বেশি, এসব বিষয়ে ভাবনা চিন্তা করেন?

কবিতা আমার ভালোবাসার জায়গা। চিন্তা ভাবনা করে কি কেউ ভালোবাসে? বই বিক্রি নিয়ে আমি খুব বেশী চিন্তিত নই। অন্যদিকে কবিতার পাঠক কম হলেও একটা ভালো সংখ্যক পরিণত কবিতার পাঠক আছেন ও ভবিষ্যতেও থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস। যদি এই পাঠকের একটা অংশের মধ্যে আমার লেখা পৌঁছয় তাহলেই আমি খুশি।

৪। মনে আছে, ম্যানুস্ক্রিপ্ট ফাইনালাইজ করার মুহূর্তে “দেশ”-পত্রিকা দপ্তর থেকে চিঠি পেলেন। আপনার একটি কবিতা নির্বাচিত হয়েছে। আপনি আনন্দিত, এটা বুঝতে পারছি। স্বনামধন্য পত্রিকায় কবিতা প্রকাশ কতোটা গুরুত্বপূর্ণ আপনার কাছে?

“দেশ” পত্রিকায় কবিতা মনোনীত হওয়া নিঃসন্দেহে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দের। প্রথমত মনোনীত ও প্রকাশিত হবে এই আশাতেই তো কবিতা পাঠানো। দ্বিতীয়ত এর মাধ্যমে বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে পৌঁছনোর একটা সুযোগ থাকছে। এতদিন আমার কবিতা কিছু আন্তরজাল পত্রিকা, লিটিল ম্যাগাজিন ও ফেসবুক এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দেশ এর মত বহুল প্রচারিত পত্রিকায় সুযোগ পাওয়াটা তাই আমার কাছে সৌভাগ্যের।

৫। প্রথম কবিতার বই, সম্পাদিত কবিতার সংকলন। কবিতার এডিটিং-এ বিশ্বাস করেন আপনি? বিশেষত সম্পাদক যখন কবি নিজে নন, অন্য কেউ।

আমার মনে হয় কবিতা সংকলনে সম্পাদকের ভূমিকা অনেকটা টেস্ট ক্রিকেটের একজন সফল ওপেনারের মত যার মূল কৃতিত্ব হল ভালো বল ছাড়ায় ও সঠিক বল নির্বাচন করে খেলায়। অবশ্যই সম্পাদকের আগে লেখক নিজেই নিজের লেখা সম্পাদনা করেন। কিন্তু নিজের লেখার প্রতি লেখকের কিছু দুর্বলতা থাকেই আর সেখানেই সম্পাদক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। আমার ক্ষেত্রে প্রায় ৭০ টি কবিতা থেকে ঝাড়াই বাছাই করে ৪৬ টি কবিতা নির্বাচন, সেগুলির কি ক্রমে থাকবে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলিতে সম্পাদকের ভূমিকা অপরিসীম। নির্বাচিত ও প্রকাশিত বেশিরভাগ কবিতাতেই সম্পাদক কলম ছোঁয়ান নি। অল্প কিছু কবিতাতে ২-৪ টি শব্দ অদল বদল করেছেন ও ৩-৪ টি কবিতাতে কিছু কাটছাঁট করেছেন। এর থেকেই বোঝা যায় কবিতাগুলির স্বকীয়তা বজায় রাখতে সম্পাদক কতটা যত্নশীল ছিলেন।

৬। সম্পাদক হিসেবে কবি রণদেব দাশগুপ্ত কেন? প্রকাশকের সিদ্ধান্ত নাকি আপনার?

সম্পাদক হিসেবে রণদেব দাশগুপ্ত সম্পূর্ণ লেখকের নির্বাচন। এক্ষেত্রে প্রকাশক কোনও ভূমিকা নেননি। সম্পাদক – কবির সম্পর্ক মাস্টারমশাই – ছাত্রের সম্পর্ক নয়, বরং দুজন সহযোদ্ধার মধ্যের সম্পর্কের মত। রণদেবদার সাথে স্বল্প ব্যক্তিগত পরিচয়ে ও তাঁর লেখা পড়ে তাঁর সাথে আমি গভীর একাত্মতা অনুভব করি। তাই তাঁকে সম্পাদক হিসেবে আমন্ত্রন করতে কোনও দ্বিধা বোধ করিনি। সম্পাদকের ভূমিকা সম্পর্কে আমার ধারণার কথা আগেই বলেছি এবং আমার মনে হয়েছিল এই গুণগুলি তাঁর মধ্যে আছে। অন্যদিকে তিনিও স্বল্প পরিচয়েও আমার বইটি সম্পাদনা করতে রাজি হয়েছিলেন এটা তাঁর ঔদার্য। এই সংযোগে তুমিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নিয়েছিলে, কিরীটী।

৭। কবিতার ভাষা, উপস্থাপনা নিয়ে অনেক রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা হচ্ছে। আমি নিশ্চিত, কিছু খোঁজ খবর আপনিও রাখেন। আধুনিক কবিতা শৈলী সম্পর্কে আপনার চিন্তা ভাবনা জানতে চাইব।

এটা আমাদের গর্বের ও সৌভাগ্যের বিষয় যে বাংলা কবিতা সবসময়েই আন্তর্জাতিক কবিতা (সাহিত্য) যুগের সাথে সমান্তরালে চলেছে। ফলে সঠিক সময়েই প্রাক-আধুনিক থেকে আধুনিক হয়ে উত্তরাধুনিকে আমরা পৌঁছেছি বিভিন্ন গোষ্ঠীর, ব্যক্তির বা আন্দোলনের সাথে। উত্তরাধুনিক যুগ কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে সমাপ্ত হয়ে গেছে যদিও বর্তমান সাহিত্য যুগকে সঠিক ভাবে রুপায়ন করা হয়নি। কেউ বলছেন বর্তমান যুগ উত্তর-উত্তরাধুনিক, কিন্তু উত্তরাধুনিকের অনেক বৈশিষ্ট্য বর্তমান সাহিত্য যুগেও স্পষ্টত বিদ্যমান। Intertextuality, Metafiction, Magic realism, Fragmentation ইত্যাদি কলাকৌশল এখনও সমান ভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। অনেক নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষাও হচ্ছে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে কিন্তু এর মধ্যে কবিতাকে বা সাহিত্যকে বজায় রাখাটা খুব জরুরি। কোনও technique ই কিন্তু সাহিত্যের ওপরে নয়।

৮। প্রিয় কবি কে কে? তাঁদের কবিতা আপনাকে ঠিক কীভাবে প্রভাবিত করে বলে আপনার মনে হয়?

প্রিয় কবির তালিকা তৈরি করতে গেলে তা অত্যন্ত দীর্ঘ হবে কারন অনেক কবিরই কিছু কিছু কবিতা মনে দাগ কেটেছে। কিন্তু সামগ্রিক অর্থে যারা আমাকে প্রভাবিত করেছেন তাঁদের কথাই বলছি। শৈশব শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত দিয়ে। কৈশোরে সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে এলেন জীবনানন্দ। এর মধ্যে বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখ মনে দাগ কাটছিলেন। তারপর একে একে সুভাষ, সুনীল, শক্তি, নীরেন্দ্রনাথ, শঙ্খ ঘোষ, বিনয় মজুমদার ব্যাপকভাবে প্রানের কাছাকাছি এসে গেলেন। ৯০এর দশকে জয় গোস্বামী চমৎকৃত ও মন্ত্রমুগ্ধ করে দিলেন। এরপর বহুদিন আমি কবিতার থেকে অনেক দূরে ছিলাম পেশাগত কারণে। আবার নতুন করে কবিতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন হওয়ার পর দেখলাম অনেক কিছু বদলে গেছে। নতুন নতুন কবি এসেছেন ও পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। এর মধ্যে এখন বিভাসদা ও রণদেবদার কবিতা মন দিয়ে পড়ি। শান্তি পাই। আমার বিজ্ঞানের সঙ্গে যোগ অত্যন্ত নিবিড় হওয়ার কারণে সময় খুব কম। তাই যতটুকু সময় পাই বিভিন্ন ধরনের লেখা পড়ার চেষ্টা করি। কৈশোরের লেখার মধ্যে জীবনানন্দের প্রভাব পড়ত বলে অনেকেই বলতেন। ধীরে ধীরে চেষ্টা করেছি প্রিয় কবিদের প্রভাব মুক্ত হয়ে নিজস্ব ভাষায় লিখতে। কতটা সফল হয়েছি পাঠক বলতে পারবেন।

৯। পাঠকের মনন, বিশেষ করে কবিতার যে নির্দিষ্ট পাঠক সমাজ তাঁদের কাছে আরও সহজে পৌঁছোবার কোনও রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন কোনোদিন?

আমার মনে হয় সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভাবনার সাথে সংযোগ রেখে লিখলে পাঠকের মনের কাছে পৌঁছনো যাবে। এর জন্য নিজের ভাবনার, বিষয়ের ও প্রকাশের মধ্যে বৈচিত্র্য আনা দরকার। নিজেকে ভেঙ্গে নতুন করে গড়তে না পারলে পাঠক এক সময়ে মুখ ফিরিয়ে নেবেন ও আপনি একটি বিশেষ সময়ের বা দশকের কবি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন।

১০। আপনার পরবর্তী কাজ সম্পর্কে জানতে চাইব।

কবিতা লেখা চলছে। পরবর্তী কাজ অবশ্যই বাংলা কবিতার ওপরেই হবে। তবে এর বেশি কিছু বিশদে এখনই বলতে পারছি না।

9 Comments

Filed under Uncategorized